বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন
দায়িত্বরত এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের দুর্ব্যবহারের জেরে দুই ছাত্রের ওপর বহিরাগতদের হামলার ঘটনায় উত্তাল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করায় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। মঙ্গলবার বিকালে প্রশাসনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি দাবি করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজের দুই শি¶ার্থীর ওপর বহিরাগতদের হামলার ঘটনায় হত্যাচেষ্টা এবং নারী চিকিসৎককে শ্লীলতাহানির অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে মামলা করা হয়। দুই মামলায় আটজনের নামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ আলী মাহমুদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘সোমবার রাতে আটক মোহিদ হাসান রাব্বি ও এহসান আহম্মদকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
হাসপাতালের দুই ছাত্রের ওপর হামলার ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছে। এ ছাড়া হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসকের শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে হয়েছে আরেক মামলা। এ মামলায় আবদুল্লাহ নামের এক আসামির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোমবার রাতে মোহিদ হাসান রাব্বি (২৭) ও এহসান আহমদকে (২২) আটক করে পুলিশ। এ দুজনই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। হাসান রাব্বি সিলেট মহানগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
মঙ্গলবার বিকালে সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ইমার্জেন্সি ও হৃদরোগ বিভাগ ছাড়া সব বিভাগে তারা কর্মরিবতি পালন করছেন। ফলে ব্যাহত হচ্ছে হাসাপাতালের রোগীদের চিকিৎসা সেবা। সন্ধ্যা ৭টায় হাসপাতালের ২য়, ৩য় ও ৪র্থ তলায় সার্জারি, মেডিসিন ও গাইনি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, এসব ওয়ার্ডে স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা নেই। উত্তপ্ত অবস্থার কারণে ভর্তি অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায় নার্সরাই চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রোগী জানান, সকালে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা নিয়মিত রুটিন চেকআপে এসেছিলেন। তবে যে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন তাদের দেখা মিলছে না। নার্সরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন, অবশ্য জরুরি প্রয়োজনে মিলছে ডাক্তারও।
একাধিক রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমরা খুব আতঙ্কে আছি। কখন জানি কী হয়। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে।’
এ পরিস্থিতি নিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সম্মেলন কক্ষে মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতারা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মঈনুল হক, সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ প্রমুখ।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও তাদের ৫ দফা দাবির প্রেক্ষিতে বৈঠকে বসি। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। হাসপাতালের নিরাপত্তায় ৩০ সদস্য বিশিষ্ট পুলিশ দল কাজ করছে। তা ছাড়া অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। আমরা আশা করছি পুলিশ এদেরকেও দ্রুত গ্রেপ্তারে সমর্থ হবে।’
এদিকে বৈঠক শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মতিউর রহমান বলেন, ‘সব আসামি গ্রেপ্তার এবং আমাদের নিরাপত্তায় দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। চিকিৎসক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-লাঞ্ছনা আর মেনে নেওয়া হবে না।’
গত সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ গেইটের পাশে হামলার শিকার হন কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র নাইমুর রহমান ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রুদ্র নাথ। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনার প্রতিবাদে আহত ছাত্রদের সহপাঠী ও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে সোমবার রাতে প্রায় চার ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন।
সে সঙ্গে হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন। দুই ছাত্রের ওপর হামলার ঘটনায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরাও রাতে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। আন্দোলনকারীরা জানান, গত রবিবার রাতে হাসপাতালে একজন নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক লাঞ্ছিত হন। ওই সময় লাঞ্ছনাকারী দুই জনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনার জেরে সোমবার রাতে বহিরাগতরা কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।